ঢাকার তুরাগ নদী থেকে উদ্ধার হওয়া বস্তাবন্দি এক ব্যক্তির মরদেহের পরিচয় শনাক্ত এবং আলোচিত ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মেট্রো (উত্তর)। এ ঘটনায় জড়িত হানিট্র্যাপ ও মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একইসঙ্গে নিহতের ছিনতাইকৃত প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে এবং এক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে।
শনিবার (৬ জুন) পিবিআই সদরদপ্তর এ তথ্য নিশ্চিত করে।
মামলার বাদী ফারজানা আক্তার জানান, তার স্বামী মো. লোকমান সরদার (৩৮) পেশায় একজন চালক ছিলেন। তিনি ইনড্রাইভ ও পাঠাওয়ের মাধ্যমে ভাড়ায় গাড়ি চালাতেন। গত ৩০ মে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে রাজধানীর কুড়িল এলাকার বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার পর আর ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো খোঁজ পাননি।
পরে বরিশালের গৌরনদী থানা পুলিশ লোকমানের স্বজনদের জানায়, তুরাগ নদীর দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতের কাঁধ থেকে হাতের আঙুল পর্যন্ত চামড়া ছিল ছোলা। এছাড়া তার বাম হাত ও বাম পা ভাঙা ছিল এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়। এ ঘটনায় ফারজানা আক্তার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, চক্রের সদস্য জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা কৌশলে লোকমান সরদারকে টঙ্গীর পাখির বাজার এলাকায় ডেকে নেন। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এস এম সালমান, আদিব ইসলাম, সবুজ মিয়াসহ আরও কয়েকজন তাকে আটক করে মারধর করে।
তদন্তে আরও জানা যায়, মাদক সেবনের অভিযোগ তুলে লোকমানের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। পরে তাকে নির্মমভাবে মারধর করে হাত-পা বেঁধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকারও ছিনিয়ে নেয় চক্রটি।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই ঢাকা, গাজীপুর ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- এস এম সালমান (২৯), আদিব ইসলাম (১৯), জান্নাতুল ফেরদৌস মীম ওরফে আনিবা জারা (২১) এবং সবুজ মিয়া (৩৫)।
অভিযানের সময় ভিকটিমের ছিন্তাইকৃত প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৮-১৬৬৮) উদ্ধার করা হয়। এছাড়া দুটি মোবাইল ফোন এবং বিকাশ লেনদেনসংক্রান্ত প্রমাণপত্র জব্দ করা হয়েছে।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তারকৃত আসামি এস এম সালমান আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, চক্রটি কথিত স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে টার্গেট করত। নারী সদস্যের মাধ্যমে ফাঁদে ফেলে দেহব্যবসা বা মাদক সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের মূল কৌশল।
পিবিআই জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামালের তত্ত্বাবধানে এবং ডিআইজি (ক্রাইম সেন্ট্রাল) মো. হুমায়ূন কবিরের নির্দেশনায় মামলাটির তদন্ত পরিচালনা করেন পিবিআই ঢাকা মেট্রো (উত্তর)-এর এসআই মো. জাকারিয়া আলম।